

প্রবীণ সাংবাদিক শাহজাহান খানের বর্ণাঢ্য জীবন: কলমযোদ্ধার ৫৫ বছরের পথচলা
মাদারীপুরের সাংবাদিকতার জগতে এক কিংবদন্তী নাম শাহজাহান খান, যিনি দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে নিরলসভাবে সংবাদ সংগ্রহ করে গেছেন। তৎকালীন ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমা সদরের পাবলিক লাইব্রেরীর কাছেই ছিল তাঁর বাড়ি। গতকাল তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তাঁর এই দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়েছিল একটি সাধারণ পাঠের নেশা থেকে, যা তাকে একজন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
সাংবাদিকতার হাতেখড়ি ও অনুপ্রেরণা
স্কুলজীবন থেকেই শাহজাহান খানের সংবাদপত্র পড়ার প্রতি ছিল তীব্র আগ্রহ। ক্লাস নাইন থেকেই তিনি পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে নিয়মিত দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক আজাদ-এর পাতা উল্টাতেন। তবে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো লাইব্রেরীতে রাখা হতো না। প্রতি সোমবার ঢাকা থেকে লঞ্চে আসা সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকাটি কেনার জন্য তিনি পায়ে হেঁটে দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পুরান বাজারের নেছারিয়া লাইব্রেরীতে যেতেন।
এই লাইব্রেরীর এজেন্ট খন্দকার নেসার আহম্মেদের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। একসময় খন্দকার নেসার আহম্মেদ খুশি হয়ে তাঁকে বিনামূল্যেও পত্রিকা দিতেন। এই পাঠের নেশা থেকেই একসময় তিনি সাংবাদিকতা করার অনুপ্রেরণা পান।
চ্যালেঞ্জ ও টিকে থাকার লড়াই
সাংবাদিকতার শুরুর দিকে তিনি হেঁটে বা নৌকাযোগে তখনকার মাদারীপুর মহকুমার অংশ শরীয়তপুর জেলাসহ দূর-দূরান্তে সংবাদ সংগ্রহে যেতেন। এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁকে বহুবার প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
- ক্ষমতার রোষানল: গণমাধ্যমে কাজ করার সময় তাঁকে মন্ত্রীর হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকের ষড়যন্ত্রের শিকারও হয়েছেন। রাজনৈতিক নেতাদের রোষানলে পড়তে হয়েছে বারবার।
- পেশার প্রতি মোহ: স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দুইবার সরকারি চাকরির সুযোগ পেলেও সংবাদের প্রতি থাকা তীব্র ভালোবাসার কারণে তিনি সেই সুযোগ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেননি। সকল বাধা সত্ত্বেও, তিনি মাদারীপুরের মানুষের কাছে একজন নির্ভরযোগ্য সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
কর্মজীবন ও শিক্ষাজীবন
শাহজাহান খান তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন মাদারীপুর ইউনাইটেড ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে, যেখানে তিনি ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ফরিদপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হলেও সেশন জটের কারণে ফিরে এসে নাজিমউদ্দীন কলেজে ভর্তি হন। কলেজ জীবনে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের খবরগুলো তাঁকে সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট করে।
তিনি তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমা সংবাদদাতা ডা. এম এম কাসেমের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করেন এবং তাঁর অনুপ্রেরণায় সাপ্তাহিক পূর্বদেশে সংবাদ পাঠানো শুরু করেন।
- দৈনিক পূর্বদেশ: সাপ্তাহিক পূর্বদেশ দৈনিকে রূপান্তরিত হলে তিনি ১৯৭০ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাদারীপুর মহকুমা সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ পান এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ জুন পর্যন্ত কাজ করেন।
- দৈনিক ইত্তেফাক: দৈনিক পূর্বদেশ বন্ধ হওয়ার পর তিনি দুই বছর দৈনিক নিউ ন্যাশন পত্রিকার মাদারীপুর করেসপন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে মাসিক মাত্র ২০ টাকা সম্মানীতে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তিনি এই পত্রিকায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাংবাদিক অঙ্গনে নেতৃত্ব
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় প্রেসক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি মাদারীপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক এবং সর্বশেষ সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
সহকর্মীর স্মৃতিচারণ
মাদারীপুরের সাংবাদিক মহলে শাহজাহান খান তাঁর সদা হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর এক সহকর্মী স্মরণ করে বলেন, “২০২১ সালে বসুন্ধরা গ্রুপ যখন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমি কালের কণ্ঠের সুবাদে তাঁকে মনোনীত করে ঢাকায় নিয়ে যাই। একসাথে দুটি দিন আমরা খোশগল্পে কাটিয়েছি। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী এতটাই মিশুক ছিলেন যে সেই মুহূর্তগুলো আজও স্মৃতিতে অম্লান।”
দীর্ঘ ৫৫ বছরের কর্মময় জীবনের সমাপ্তি টেনে এই প্রবীণ সাংবাদিকের চলে যাওয়া মাদারীপুর জেলার সাংবাদিকতা জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।

Reporter Name 