
বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে ভেজাল খাদ্যের উপস্থিতি কেবল একটি সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযান এবং গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চাল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা—সবখানেই মিশছে বিষাক্ত সব উপাদান। যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব চিত্র। চুয়াডাঙ্গার একটি কারখানায় ডালডার ভেতর মৃত ইঁদুরের উপস্থিতি কিংবা নামী ব্র্যান্ডের নামে মেয়াদোত্তীর্ণ ও মানহীন পণ্য বাজারজাত করার ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। বিশেষ করে ইফতারি বা রাস্তার পাশের খাবারে কাপড়ের রং এবং পোড়া তেলের যথেচ্ছ ব্যবহার সাধারণ মানুষের লিভার, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ খাদ্যপণ্যে কোনো না কোনো ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে।
শাকসবজি ও ফলমূল: প্রায় ৫০ শতাংশ সবজি ও ৩৫ শতাংশ ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।
ভারী ধাতু: চাল ও হলুদে আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম ও সিসার মতো মারাত্মক ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে।
লবণ ও মাছ: লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি সিসা এবং মাছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকদের মতে, খাবারে ব্যবহৃত ফরমালিন, কার্বাইড বা ইথোফেন সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র এবং লিভারের কোষ ধ্বংস করে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা): তাদের গবেষণা অনুযায়ী, ভেজাল খাবারের প্রভাবে প্রতিবছর দেশে লাখ লাখ মানুষ ক্যান্সার, কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন।
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম: বিশিষ্ট এই চিকিৎসকের মতে, অতিরিক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাবার দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করে, যা থেকে বাঁচতে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অভ্যাস করা জরুরি।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ভেজাল খাদ্যের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারির অভাব রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া জানান, জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত ল্যাবের অভাব তাদের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে, যদিও নতুন ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে।