

💔 প্রেমঘটিত অপমানের জের: সালিশে অপদস্থ হয়ে মাদারীপুরে স্কুলছাত্রীর আত্মহনন, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি
প্রকাশ্যে অপমানের পরদিন সকালে উদ্ধার হয় সুমাইয়ার ঝুলন্ত দেহ, ন্যায়বিচারের দাবিতে উত্তাল স্থানীয় জনতা
মাদারীপুর: প্রেমঘটিত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা বাড়িতে এসে প্রকাশ্যে অপমান ও অপদস্থ করার জেরে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় সুমাইয়া আক্তার (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) রাতে উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের আলেপুর এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে, যা পুরো এলাকায় গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও মর্মান্তিক পরিণতি
নিহত সুমাইয়া আক্তার আলেপুর গ্রামের আবুল হোসেনের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী যুবক রিফাত উকিলের সঙ্গে সুমাইয়ার একটি প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই ঘটনার মীমাংসার নামে বাড়াবাড়ি শুরু করেন।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) সন্ধ্যায় আলেপুর গ্রামের প্রভাবশালী ইব্রাহিম মাদবর তাঁর দলবল নিয়ে প্রেমিক রিফাত উকিলকে সঙ্গে নিয়ে সুমাইয়াদের বাড়িতে চড়াও হন। সেখানে তাঁরা সুমাইয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং প্রকাশ্যে অপমান-অপদস্ত করেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সমাজের চোখে এভাবে অপমানিত হওয়া সুমাইয়ার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। প্রকাশ্যে ঘটা এই অপমান সইতে না পেরে মানসিকভাবে ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে সে। ওইদিন রাতেই সুমাইয়া নিজ ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
পরিবারের আহাজারি ও ন্যায়বিচারের দাবি
আজ শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালে মাদারীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে নিহত স্কুলছাত্রীর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে দুপুরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত সুমাইয়ার বাবা আবুল হোসেন সাংবাদিকদের সামনে অভিযোগ করে বলেন, “স্থানীয় প্রভাবশালী ইব্রাহিম মাদবর এবং তার লোকেরা আমাদের বাড়িতে এসে আমার মাসুম মেয়েকে এমন সব কুরুচিপূর্ণ ও অপমানজনক কথা বলেছে, যা সইতে না পেরে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। আমার মেয়ের ওপর এই মানসিক নিপীড়ন যারা চালিয়েছে, তারা সবাই আমার মেয়ে হত্যার প্ররোচনাকারী। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সঠিক বিচার চাই।”
আলেপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইব্রাহিম মাদবর এলাকায় প্রায়ই সালিশের নামে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব খাটান। একটি প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে এভাবে একটি কিশোরীকে সকলের সামনে অপমান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রামবাসী এই ঘটনার বিচার দাবি করছেন।
পুলিশের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া
এ বিষয়ে শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, “ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ইতোমধ্যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার ভিত্তিতে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঘটনায় প্ররোচনাকারী এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন এবং নিশ্চিত করবেন যেন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে না থাকতে পারে। স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হলে, তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হবে।

Reporter Name 